Skip to content

ভারতের সংবিধানের ঐতিহাসিক পটভূমি (Historical Background of the Constitution of India)

১৬০০ সালে রানী এলিজাবেথ (প্রথম)-এর সনদের (চার্টার) মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে প্রবেশ করে। ১৭৬৫ সাল পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শুধুমাত্র একটি বাণিজ্যিক কোম্পানি হিসেবে কাজ করছিল। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভ করে, যার ফলে বাংলা, বিহার এবং ওড়িশার রাজস্ব ও দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থার অধিকার পায়। ১৮৫৮ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ক্রাউন (রাজমুকুট) সরাসরি ভারত পরিচালনা করে।

বলা যেতে পারে যে, ১৭৭৩ সাল থেকে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন চলে এবং ১৮৫৮ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ রাজমুকুটের (British Crown) শাসন চলে।

রেগুলেটিং অ্যাক্ট, ১৭৭৩:

  1. এই অ্যাক্টের মাধ্যমে ‘গভর্নর-জেনারেল অব বেঙ্গল‘ পদটির সৃষ্টি হয় এবং লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার প্রথম গভর্নর-জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত হন।
  2. এর মাধ্যমে বোম্বে এবং মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিকে বাংলার গভর্নর-জেনারেলের অধীনে নিয়ে আসা হয়।
  3. ১৭৭৪ সালে কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে একজন প্রধান বিচারপতি এবং তিন জন অন্যান্য বিচারপতি নিযুক্ত হন।
  4. এই আইন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসা করা এবং স্থানীয়দের কাছ থেকে ঘুষ বা উপহার নেওয়া থেকে বিরত করে।
  5. কোম্পানির চালিকাশক্তি ‘কোর্ট অব ডিরেক্টর্স‘ (Court of Directors)-কে ভারতের রাজস্ব, সামরিক এবং দেওয়ানি বিষয়াবলি সম্পর্কে নিয়মিত ব্রিটিশ সরকারকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

অ্যামেন্ডিং অ্যাক্ট, ১৭৮১ (Amending Act of 1781)

১৭৭৩ সালের রেগুলেটিং অ্যাক্টের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো দূর করার জন্য ১৭৮১ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট একটি আইন পাস করে, যা অ্যাক্ট অব সেটলমেন্ট (Act of Settlement) নামেও পরিচিত।

১. গভর্নর-জেনারেল এবং তাঁর কাউন্সিলকে তাঁদের সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ারের বাইরে রাখা হয়।

২. রাজস্ব এবং রাজস্ব সংগ্রহের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত বিষয়কে সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ার থেকে মুক্ত করা হয়।

৩. প্রাদেশিক আদালতের (Provincial Courts) যেকোনো আপিল সুপ্রিম কোর্টে না গিয়ে সরাসরি ‘গভর্নর-জেনারেল-ইন-কাউন্সিল’-এর কাছে যাওয়ার নিয়ম করা হয়।

৪. গভর্নর-জেনারেল-ইন-কাউন্সিলকে প্রাদেশিক আদালত এবং কাউন্সিলগুলোর (Provincial Courts and Councils) জন্য নিয়ম ও বিধিমালা প্রণয়নের দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

পিটস ইন্ডিয়া অ্যাক্ট, ১৭৮৪ (Pitt’s India Act of 1784)

১. বাণিজ্যিক রাজনৈতিক কাজের পৃথকীকরণ: এই আইনের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার কোম্পানির বাণিজ্যিক এবং রাজনৈতিক কার্যাবলীকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়।

২. দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা (Dual System of Control):

  • কোম্পানির বাণিজ্যিক বিষয় পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় ‘কোর্ট অব ডিরেক্টর্স’ (Court of Directors)-কে।
  • কোম্পানির রাজনৈতিক বিষয় দেখভাল ও পরিচালনার জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটি সংস্থা বোর্ড অব কন্ট্রোল‘ (Board of Control) গঠিত হয়।
৩. গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব:
  • এই আইনের মাধ্যমেই প্রথমবার ভারতে কোম্পানির অধীনস্থ এলাকাগুলোকে ভারতে ব্রিটিশ ভূখণ্ড‘ (British Possessions in India) বলে আখ্যায়িত করা হয়।
  • এটি ভারতে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ও সামরিক ব্যবস্থার ওপর ব্রিটিশ সরকারের পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

অ্যাক্ট অব ১৭৮৬ (Act of 1786)

১৭৮৬ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসকে বাংলার গভর্নর-জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তিনি দুটি প্রধান শর্ত আরোপ করেন:

  1. বিশেষ বা জরুরি পরিস্থিতিতে তিনি তাঁর কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত বাতিল (Overrule) করে নিজের সিদ্ধান্ত প্রয়োগ করার ক্ষমতা চান।
  2. তাঁকে ‘কমান্ডার-ইন-চিফ’ (সর্বাধিনায়ক) পদেও অধিষ্ঠিত করতে হবে।

১৭৮৬ সালের আইনের মাধ্যমে তাঁর এই দুটি শর্ত বা দাবিই পূরণ করা হয়।

চার্টার অ্যাক্ট, ১৭৯৩ (Charter Act of 1793)

১. ক্ষমতার সম্প্রসারণ: এই আইনের মাধ্যমে গভর্নর-জেনারেলকে বোম্বে ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ক্ষমতা দেওয়া হয় (লর্ড কর্নওয়ালিসকে দেওয়া বিশেষ ক্ষমতা পরবর্তী সকল গভর্নর-জেনারেল ও গভর্নরদের ওপর প্রসারিত করা হয়)।

২. বাণিজ্যিক একচেটিয়া অধিকার বৃদ্ধি: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ভারতে আরও ২০ বছরের জন্য একচেটিয়া বাণিজ্য করার অধিকার প্রদান করা হয়।

৩. কমান্ডারইনচিফ পদে শর্ত: গভর্নর-জেনারেলের কাউন্সিলের সদস্য হওয়ার জন্য ‘কমান্ডার-ইন-চিফ’-কে আলাদাভাবে মনোনীত করা বাধ্যতামূলক করা হয় (তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাউন্সিলের সদস্য হতে পারবেন না)।

৪. বেতন রাজস্ব ব্যবস্থা: নির্দেশ দেওয়া হয় যে ‘বোর্ড অব কন্ট্রোল’-এর সদস্য এবং তাঁদের কর্মীদের বেতন সম্পূর্ণভাবে ভারতের রাজস্ব (ভারতীয় কোষাগার) থেকেই প্রদান করা হবে।

চার্টার অ্যাক্ট, ১৮১৩ (Charter Act of 1813)

  1. বাণিজ্যিক একচেটিয়া অধিকারের অবসান: এই আইনের মাধ্যমে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের অবসান ঘটে। তবে চা এবং চীনের সাথে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কোম্পানির একচেটিয়া অধিকার বজায় থাকে।
  2. খ্রিস্টান মিশনারিদের আগমন ও শিক্ষা বিস্তার: ভারতে ধর্ম প্রচার এবং পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের জন্য খ্রিস্টান মিশনারিদের ভারতে আসার অনুমতি দেওয়া হয়
  3. স্থানীয় সরকারের কর আরোপের ক্ষমতা: স্থানীয় সরকারগুলোকে জনগণের ওপর কর (Tax) আরোপ করার ক্ষমতা দেওয়া হয় এবং কর না দিলে তাদের শাস্তি দেওয়ার অধিকার প্রদান করা হয়।

চার্টার অ্যাক্ট, ১৮৩৩ (Charter Act of 1833)

  1. এই অ্যাক্টের মাধ্যমে ‘গভর্নর-জেনারেল অব বেঙ্গল’ পদটিকে পরিবর্তন করে গভর্নরজেনারেল অব ইন্ডিয়া করা হয় এবং লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ভারতের প্রথম গভর্নর-জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত হন।
  2. গভর্নর-জেনারেল অব ইন্ডিয়াকে বাংলা, বোম্বে ও মাদ্রাজের (সমগ্র ব্রিটিশ ভারত) সমস্ত দেওয়ানি ও সামরিক ক্ষমতা প্রদান করা হয়।
  3. এই অ্যাক্টের পূর্বে তৈরি আইনগুলোকে বলা হতো রেগুলেশনস‘ (Regulations), কিন্তু এই অ্যাক্ট থেকে তৈরি আইনগুলোকে বলা শুরু হয় অ্যাক্ট‘ (Acts)
  4. ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে এটিকে একটি নিখাদ প্রশাসনিক বা শাসন সংস্থায় রূপান্তর করা হয়। ভারতে কোম্পানির সমস্ত ভূখণ্ড পরিচালিত হতে থাকে “ইন ট্রাস্ট ফর হিজ ম্যাজেস্টি, হিজ হেয়ার্স অ্যান্ড সাকসেসর্স” (His Majesty, His Heirs and Successors)-এর নামে।

চার্টার অ্যাক্ট, ১৮৫৩ (Charter Act of 1853)

  1. এই আইনের মাধ্যমে গভর্নর-জেনারেলের কাউন্সিলের আইনপ্রণয়ন সংক্রান্ত (Legislative) এবং নির্বাহী সংক্রান্ত (Executive) কাজগুলোকে প্রথমবারের মতো আলাদা করা হয়।
  2. সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা ভারতীয়দের জন্য উন্মুক্ত করা হয় এবং এর সঠিক ব্যবস্থার জন্য ১৮৫৪ সালে মেকলে কমিটি (Macaulay Committee) গঠন করা হয়।
  3. প্রথমবারের মতো ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা হয়, যেখানে ৬ জন নতুন সদস্যের মধ্যে ৪ জন সদস্য বাংলা, বোম্বে, মাদ্রাজ এবং আগ্রার স্থানীয় সরকার থেকে নিযুক্ত হন।

গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট, ১৮৫৮ (Government of India Act of 1858)

  1. এই অ্যাক্টের মাধ্যমে ভারতের শাসনক্ষমতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে সরাসরি ব্রিটিশ রাজমুকুটের (British Crown) অধীনে স্থানান্তরিত হয়।
  2. ‘গভর্নর-জেনারেল অব ইন্ডিয়া’ পদটিকে পরিবর্তন করে ‘ভাইসরয় অব ইন্ডিয়া‘ করা হয় এবং লর্ড ক্যানিং ভারতের প্রথম ভাইসরয় হিসেবে নিযুক্ত হন।
  3. বোর্ড অব কন্ট্রোল এবং কোর্ট অব ডিরেক্টর্স বিলুপ্ত করে ভারতে চলে আসা দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা বন্ধ করা হয়।
  4. ‘সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া’ (ভারত সচিব) নামে একটি নতুন পদ ও কার্যালয় তৈরি করা হয়, যিনি ব্রিটিশ ক্যাবিনেটের একজন সদস্য ছিলেন।

ইন্ডিয়ান কাউন্সিলস অ্যাক্ট, ১৮৬১ (Indian Councils Act of 1861)

  1. এই অ্যাক্টের মাধ্যমে আইন তৈরির প্রক্রিয়ায় ভারতীয়দের অন্তর্ভুক্ত করার সূচনা হয়; লর্ড ক্যানিং বেনারসের রাজা, পাটিয়ালার মহারাজা এবং স্যার দিনকর রাওকে তাঁর আইন পরিষদে মনোনীত করেন।
  2. কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে ভাইসরয়কে লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সম্মতি বা অনুমতি ছাড়াই অর্ডিন্যান্স জারি করার ক্ষমতা দেওয়া হয়, যার মেয়াদ ছিল ৬ মাস।

ইন্ডিয়ান কাউন্সিলস অ্যাক্ট, ১৯০৯ (Indian Councils Act of 1909)

  1. এই অ্যাক্টটিকে মরলেমিন্টো সংস্কার (Morley-Minto Reforms) বলা হয়, যেখানে লর্ড মরলে ছিলেন তৎকালীন ভারত সচিব (Secretary of State for India) এবং লর্ড মিন্টো ছিলেন ভারতের ভাইসরয়।
  2. এই অ্যাক্টের মাধ্যমে প্রথমবার ভারতীয়দের ভাইসরয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়; সত্যেন্দ্র প্রসাদ সিনহা প্রথম ভারতীয় যিনি ল মেম্বার (আইন বিষয়ক সদস্য) হিসেবে এই কাউন্সিলে যোগ দেন।
  3. প্রথমবারের মতো মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার (Separate Electorate) প্রবর্তন করা হয়, যেখানে মুসলিম প্রার্থীরা কেবল মুসলিম ভোটারদের দ্বারাই নির্বাচিত হতেন; এই কারণে লর্ড মিন্টোকে ‘সাম্প্রদায়িক নির্বাচনের জনক’ (Father of Communal Electorate) বলা হয়।

গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট, ১৯১৯ (Government of India Act of 1919)

  1. এটি ১৯২১ সালে কার্যকর হয় এবং এটি মন্টেগুচেমসফোর্ড সংস্কার (Montagu-Chelmsford Reforms) নামেও পরিচিত; যেখানে এডউইন মন্টেগু ছিলেন ভারত সচিব (Secretary of State for India) এবং লর্ড চেমসফোর্ড ছিলেন ভারতের ভাইসরয়।

  2. প্রাদেশিক বিষয়গুলোকে স্থানান্তরিত (Transferred) এবং সংরক্ষিত (Reserved)―এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়; স্থানান্তরিত বিষয়গুলো পরিচালিত হতো গভর্নর ও আইন পরিষদের মন্ত্রীদের দ্বারা, আর সংরক্ষিত বিষয়গুলো পরিচালিত হতো গভর্নর ও তাঁর এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল দ্বারা—এইভাবে প্রদেশে দ্বৈত শাসন বা ডায়ার্কি (Dyarchy) চালু হয়, যা একটি গ্রিক শব্দ ‘দ্বি-শাসন’ থেকে এসেছে।

  3. কেন্দ্রব্যবস্থায় দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা (Bicameralism) এবং প্রত্যক্ষ নির্বাচন (Direct Elections) ব্যবস্থা চালু করা হয়, যেখানে দুটি কক্ষ ছিল—উচ্চকক্ষ বা কাউন্সিল অব স্টেট (Council of State) এবং নিম্নকক্ষ বা লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি (Legislative Assembly)।

  4. ১৯০৯ সালের মতো এই অ্যাক্টের মাধ্যমে শিখ, ভারতীয় খ্রিস্টান, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান এবং ইউরোপীয়দের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রসারিত করা হয়।

  5. লন্ডনে ‘হাই কমিশনার ফর ইন্ডিয়া’ (High Commissioner for India) নামে একটি নতুন কার্যালয় তৈরি করা হয় এবং ভারত সচিবের কিছু দায়িত্ব এই কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়।

  6. এর অধীনে ১৯২৬ সালে সেন্ট্রাল পাবলিক সার্ভিস কমিশন (Central Public Service Commission) গঠিত হয় এবং প্রথমবারের মতো প্রাদেশিক বাজেটকে কেন্দ্রীয় বাজেট থেকে আলাদা করা হয়।


সাইমন কমিশন (Simon Commission)

  1. ভারতে নতুন সংবিধানের কার্যকারিতা ও শাসনতান্ত্রিক অবস্থা পর্যালোচনার জন্য ১৯২৭ সালের নভেম্বর মাসে স্যার জন সাইমনের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের একটি কমিশন গঠন করা হয়।

  2. ১৯৩০ সালে কমিশন তাদের রিপোর্ট পেশ করে এবং প্রদেশে দ্বৈত শাসন বা ডায়ার্কি তুলে দেওয়ার সুপারিশ করে; এই রিপোর্টের ওপর আলোচনার জন্য ব্রিটিশ সরকার তিনটে গোলটেবিল বৈঠক (Round Table Conferences) আয়োজন করে এবং এর ভিত্তিতে প্রস্তুতকৃত ‘শ্বেতপত্র’ (White Paper) পরবর্তীতে ১৯৩৫ সালের গভর্মেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্টে যুক্ত হয়।


কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড (Communal Award)

  1. ১৯৩২ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রামসে ম্যাকডোনাল্ড মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ও ইউরোপীয়দের পাশাপাশি অনুন্নত বা নিম্নবর্ণের হিন্দু (Depressed Classes)-দের জন্যও পৃথক নির্বাচনের ঘোষণা দেন, যা ‘কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড’ নামে পরিচিত।

  2. গান্ধীজি হিন্দু সমাজকে বিভক্ত করার এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ইয়েরাওয়াড়া জেলে (পুনে) অনশন শুরু করেন।

  3. অবশেষে কংগ্রেস নেতা ও অনুন্নত শ্রেণীর নেতাদের মধ্যে ঐতিহাসিক পুনা প্যাক্ট (Poona Pact) স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে পৃথক নির্বাচনের দাবি বাদ দিয়ে অনুন্নত শ্রেণীর জন্য যৌথ নির্বাচকমণ্ডলীর অধীনেই আসন সংরক্ষিত রাখা হয়।

গভর্মেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট, ১৯৩৫ (Government of India Act of 1935)

  1. এই আইনটি পূর্ণ দায়িত্বশীল সরকার গঠনের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল; এটি ছিল একটি দীর্ঘ ও বিস্তারিত দলিল, যাতে ৩২১টি ধারা (Sections) এবং ১০টি তপশিল (Schedules) ছিল।
  2. এই অ্যাক্টের মাধ্যমে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা ৩টি তালিকায় ভাগ করা হয়—কেন্দ্রের জন্য ‘ফেডারেল লিস্ট’ (৫৯টি বিষয়), প্রদেশের জন্য ‘প্রোভিন্সিয়াল লিস্ট’ (৫৪টি বিষয়) এবং যৌথভাবে পরিচালনার জন্য ‘কনকারেন্ট লিস্ট’ (৩৬টি বিষয়)।
  3. এটি প্রদেশে দ্বৈত শাসন (Dyarchy) ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে ‘প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন’ (Provincial Autonomy) প্রবর্তন করে, যা ১৯৩৭ সালে কার্যকর হয় এবং ১৯৩৯ সালে বন্ধ হয়ে যায়।
  4. ১১টি ব্রিটিশ ভারতের প্রদেশের মধ্যে ৬টি প্রদেশে (বাংলা, বোম্বে, মাদ্রাজ, বিহার, আসাম ও যুক্তপ্রদেশ) দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা (Bicameral Legislature) তৈরি করা হয়।
  5. ১৮৫৮ সালের গভর্মেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট দ্বারা গঠিত ‘কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া’ বিলুপ্ত করা হয়।
  6. এর ফলে ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ ভোটাধিকার লাভ করে।
  7. দেশের মুদ্রা ও ঋণ নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে ‘রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’ (RBI) প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা হয়।
  8. এটি কেবল ফেডারেল (সেন্ট্রাল) পাবলিক সার্ভিস কমিশনই নয়, বরং প্রোভিন্সিয়াল পাবলিক সার্ভিস কমিশন এবং দুই বা ততধিক রাজ্যের জন্য জয়েন্ট পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়।
  9. এর অধীনে ১৯৩৭ সালে একটি ‘ফেডারেল কোর্ট’ (Federal Court) প্রতিষ্ঠিত ও কার্যকর হয়।

ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট, ১৯৪৭ (Indian Independence Act of 1947)

  1. ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এটলি ১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করেন যে, ১৯৪৮ সালের ৩০ জুনের মধ্যে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটবে এবং ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে; কিন্তু এর ফলে মুসলিম লীগ আন্দোলন শুরু করে এবং তারা আলাদা রাজ্যের দাবি জানায় ও ভারত ভাগের দাবি তোলে।
  2. পরিশেষে ভারত স্বাধীন করার লক্ষ্যে লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারত ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেন, যা কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ মেনে নেয়।
  3. এই অ্যাক্টের মাধ্যমে ভারতীয় দেশীয় রাজ্যগুলোকে (Princely States) সুযোগ দেওয়া হয় যে, তারা ভারত অথবা পাকিস্তান যেকোনো ডোমিনিয়নে যোগ দিতে পারবে (অথবা স্বাধীন থাকতে পারবে)।
  4. এর মাধ্যমে পরবর্তীতে সিভিল সার্ভিসে ‘সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া’ কর্তৃক পদ নিয়োগ ও পদ সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়।
  5. জওহরলাল নেহেরুকে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী করা হয় এবং ভারতের গণপরিষদকে (Constituent Assembly) ভারতের প্রথম পার্লামেন্ট হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

অন্তর্বর্তী সরকার (১৯৪৬)

ক্র. নংসদস্যগণবরাদ্দকৃত দপ্তর/মন্ত্রণালয়
১.জওহরলাল নেহেরুকাউন্সিলে উপ-সভাপতি; বৈদেশিক বিষয়াবলি ও কমনওয়েলথ সম্পর্ক
২.সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলস্বরাষ্ট্র, তথ্য ও সম্প্রচার
৩.ড. রাজেন্দ্র প্রসাদখাদ্য ও কৃষি
৪.ড. জন মাথাইশিল্প ও সরবরাহ
৫.জগজীবন রামশ্রম
৬.সর্দার বলদেব সিংপ্রতিরক্ষা
৭.সি.এইচ. ভাবাপূর্ত, খনি ও শক্তি
৮.লিয়াকত আলী খানঅর্থ
৯.আবদুর রব নিস্তারডাক ও বিমান
১০.আসিফ আলীরেলপথ ও পরিবহন
১১.সি. রাজাগোপালাচারীশিক্ষা ও চারুকলা
১২.আই.আই. চুন্দ্রিগড়বাণিজ্য
১৩.গজনফর আলী খানস্বাস্থ্য
১৪.যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলআইন

দ্রষ্টব্য: অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যরা ভাইসরয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। ভাইসরয় কাউন্সিলের প্রধান পদে বহাল থাকেন, তবে জওহরলাল নেহেরুকে কাউন্সিলের উপ-সভাপতি হিসেবে মনোনীত করা হয়

২: স্বাধীন ভারতের প্রথম মন্ত্রিসভা (১৯৪৭)

ক্র. নংসদস্যগণবরাদ্দকৃত দপ্তর/মন্ত্রণালয়
১.জওহরলাল নেহেরুপ্রধানমন্ত্রী; বৈদেশিক বিষয়াবলি ও কমনওয়েলথ সম্পর্ক; বৈজ্ঞানিক গবেষণা
২.সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলস্বরাষ্ট্র, তথ্য ও সম্প্রচার; রাজ্যসমূহ
৩.ড. রাজেন্দ্র প্রসাদখাদ্য ও কৃষি
৪.মাওলানা আবুল কালাম আজাদশিক্ষা
৫.ড. জন মাথাইরেলপথ ও পরিবহন
৬.আর.কে. শানমুখম চেট্টিঅর্থ
৭.ড. বি.আর. আম্বেদকরআইন
৮.জগজীবন রামশ্রম
৯.সর্দার বলদেব সিংপ্রতিরক্ষা
১০.রাজকুমারী অমৃত কৌরস্বাস্থ্য
১১.সি.এইচ. ভাবাবাণিজ্য
১২.রফি আহমেদ কিদোয়াইযোগাযোগ
১৩.ড. শ্যমাপ্রসাদ মুখার্জীশিল্প ও সরবরাহ
১৪.ভি.এন. গ্যাডগিলপূর্ত, খনি ও শক্তি

Download the pdf

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *