Skip to content

ভারতের সংবিধান রচনার ইতিহাস (Making of the Constitution of India)

গণপরিষদের গঠন দাবি (Demand for a Constituent Assembly)

  1. ১৯৩৪ সালে প্রথম গণপরিষদ (Constituent Assembly) গঠনের ধারণা বা দাবি উত্থাপন করেন এম. এন. রায়।
  1. ১৯৩৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (INC) আনুষ্ঠানিকভাবে গণপরিষদ গঠনের দাবি উত্থাপন করে।
  1. ১৯৩৮ সালে জওহরলাল নেহেরু ঘোষণা করেন যে, স্বাধীন ভারতের সংবিধান কোনো বহিরাগত হস্তক্ষেপ ছাড়াই সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের (Adult Franchise) ভিত্তিতে নির্বাচিত গণপরিষদ দ্বারা তৈরি করা হবে।
  1. ব্রিটিশ সরকার ১৯৪০ সালে নীতিগতভাবে এই দাবি মেনে নেয়, যা ‘অগাস্ট অফার’ (August Offer) নামে পরিচিত।
  1. ১৯৪২ সালে স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস একটি খসড়া সাংবিধানিক প্রস্তাব নিয়ে ভারতে আসেন এবং জানান যে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কার্যকর হবে।
  1. তবে মুসলিম লীগ ক্রিপস মিশন (Cripps Mission)-এর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, কারণ তারা দুইটি স্বাধীন রাজ্য এবং তাদের পৃথক দুটি গণপরিষদের দাবি জানিয়েছিল।


গণপরিষদের গঠন (Composition of the Constituent Assembly)

  1. ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনার অধীনে গঠিত গণপরিষদের মোট আসন সংখ্যা ছিল ৩৮৯টি।
  1. এই ৩৮৯টি আসনের মধ্যে ২৯৬টি আসন ছিল ব্রিটিশ ভারতের জন্য এবং ৯৩টি আসন ছিল দেশীয় রাজ্যগুলোর (Princely States) জন্য বরাদ্দ।
  1. ব্রিটিশ ভারতের জন্য বরাদ্দকৃত ২৯৬টি আসনের মধ্যে ২৯২টি আসন এসেছিল ১১টি প্রাদেশিক গভর্নরের রাজ্য থেকে এবং ৪টি আসন এসেছিল ৪টি চিফ কমিশনারের প্রদেশ থেকে।
  1. প্রতিটি প্রদেশ এবং দেশীয় রাজ্যকে তাদের জনসংখ্যার অনুপাতে আসন বণ্টন করা হয়েছিল; মোটামুটি প্রতি ১০ লক্ষ (১ মিলিয়ন) জনসংখ্যার জন্য ১টি করে আসন নির্দিষ্ট করা হয়।
  1. ব্রিটিশ ভারতের আসনগুলোকে তিনটি প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাগ করা হয়েছিল—সাধারণ (General), মুসলিম এবং শিখ।
  1. প্রাদেশিক আসনগুলোতে একক হস্তান্তরযোগ্য ভোটের মাধ্যমে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation by means of Single Transferable Vote) পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়েছিল এবং দেশীয় রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিদের সংশ্লিষ্ট রাজ্যপ্রধানদের (Heads of Princely States) দ্বারা মনোনীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
  1. ব্রিটিশ ভারতের ২৯৬টি আসনের মধ্যে নির্বাচনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ২০৮টি আসন, মুসলিম লীগ ৭৩টি আসন এবং অন্যান্য ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১৫টি আসন লাভ করে।
  1. দেশীয় রাজ্যগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত ৯৩টি আসন খালি থেকে যায়, কারণ তারা গণপরিষদে যোগদান না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

গণপরিষদের কার্যাবলি (Working of the Constituent Assembly)

  1. ১৯৪৬ সালের ৯ ডিসেম্বর গণপরিষদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়; মুসলিম লীগ এই বৈঠক বয়কট করার ফলে মাত্র ২১১ জন সদস্য এতে উপস্থিত ছিলেন।
  1. প্রবীণতম সদস্য হওয়ার ফরাসি রীতি অনুসরণ করে ড. সচ্চিদানন্দ সিনহাকে গণপরিষদের অস্থায়ী সভাপতি (Temporary President) করা হয়; পরবর্তীতে ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ সভাপতি এবং এইচ. সি. মুখার্জী ও ভি. টি. কৃষ্ণমাচারী সহ-সভাপতি (Vice-Presidents) হিসেবে নির্বাচিত হন।

উদ্দেশ্যমূলক প্রস্তাব (Objective Resolution)

  1. ১৯৪৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর জওহরলাল নেহেরু ঐতিহাসিক ‘উদ্দেশ্যমূলক প্রস্তাব’ (Objective Resolution) পেশ করেন, যা সংবিধানে অন্তর্নিহিত দর্শন ও মৌলিক কাঠামোর রূপরেখা তৈরি করে।
  1. এই প্রস্তাবে ঘোষণা করা হয় যে গণপরিষদ ভারতকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও সাধারণতন্ত্র (Sovereign Independent Republic) হিসেবে ঘোষণা করার দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করছে।
  1. ব্রিটিশ ভারতের অধীনস্থ এলাকা, দেশীয় রাজ্যসমূহ এবং ভারতের অন্তর্ভুক্ত হতে ইচ্ছুক অপরাপর অঞ্চলসমূহ নিয়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ইউনিয়ন গঠিত হবে।
  1. স্বাধীন ও সার্বভৌম ভারতের সমস্ত ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের মূল উৎস হবে দেশের সাধারণ জনগণ।
  1. ভারতের সকল নাগরিকের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার, সুযোগ ও মর্যাদার সমতা, এবং চিন্তা, প্রকাশ, বিশ্বাস, ধর্মচর্চা ও সংগঠন গড়ার স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা হবে।
  1. সংখ্যালঘু, অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায় এবং উপজাতি অধ্যুষিত এলাকার জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষাকবচের (Safeguards) ব্যবস্থা করা হবে।
  1. স্বাধীন প্রজাতন্ত্রের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা এবং জল, স্থল ও আকাশে তার সার্বভৌম অধিকার সভ্য দেশসমূহের আইন ও ন্যায়বিচার অনুযায়ী বজায় রাখা হবে।
  1. ১৯৪৭ সালের ২২ জানুয়ারি গণপরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রস্তাবটি গ্রহণ করে এবং পরবর্তীতে এই প্রস্তাবেরই পরিবর্তিত রূপ আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনা (Preamble) হিসেবে গৃহীত হয়।

স্বাধীনতাবাদ আইন দ্বারা প্রবর্তিত পরিবর্তন (Changes by the Independence Act)

দেশীয় রাজ্যসমূহ (Princely States) যারা এতদিন দূরে ছিল, তারা ধীরে ধীরে গণপরিষদে যোগ দিতে শুরু করে এবং ১৯৪৭ সালের ৩ জুনের মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা গ্রহণের পর অধিকাংশ দেশীয় রাজ্যের প্রতিনিধিরা এতে অংশগ্রহণ করেন।

ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট, ১৯৪৭ গণপরিষদের ক্ষমতায় তিনটি প্রধান পরিবর্তন আনে:

  1. গণপরিষদকে একটি সম্পূর্ণ সার্বভৌম সংস্থায় পরিণত করা হয়, যা নিজের ইচ্ছামতো যেকোনো আইন তৈরি করতে পারত এবং ভারতের জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টের তৈরি যেকোনো আইন বাতিল বা পরিবর্তন করতে পারত।
  2. গণপরিষদ দুটি পৃথক দায়িত্ব পালনকারী সংস্থায় পরিণত হয়—যখন এটি সংবিধান রচনার উদ্দেশ্যে (Constituent body) বসত, তখন সভাপতি হতেন ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ; আর যখন এটি সাধারণ আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে (Legislative body) বসত, তখন সভাপতিত্ব করতেন জি. ভি. মাভালঙ্কার।  ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর সংবিধান তৈরির কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থা চালু ছিল।
  3. পাকিস্তানের আওতাভুক্ত এলাকাগুলো আলাদা হয়ে যাওয়ায় গণপরিষদের মোট সদস্য সংখ্যা ৩৮৯ থেকে কমে ২৯৯-এ নেমে আসে (১৯৪৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাগাদ)।

গণপরিষদের অন্যান্য কার্যাবলি (Other Functions Performed)

  1. ১৯৪৯ সালের মে মাসে ভারত কমনওয়েলথের সদস্য হিসেবে তার অন্তর্ভুক্তি অনুমোদন করে।
  1. ১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই জাতীয় পতাকা গ্রহণ করা হয়।
  1. সালের ২৪ জানুয়ারি জাতীয় সংগীত (National Anthem) এবং জাতীয় গীত (National Song) গ্রহণ করা হয়।
  1. ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদকে স্বাধীন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
  1. সংবিধান রচনার কাজ শেষ করতে মোট ২ বছর ১১ মাস ১৮ দিন সময় লেগেছিল এবং ১১টি অধিবেশন (Sessions) অনুষ্ঠিত হয়েছিল; এতে মোট খরচ হয়েছিল প্রায় ৬৪ লাখ টাকা।

ছবি থেকে গণপরিষদের ৮টি প্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ কমিটি (Major Committees) এবং খসড়া কমিটির (Drafting Committee) তথ্যগুলো নিচে অনুবাদ করে উপস্থাপন করা হলো:

গণপরিষদের প্রধান কমিটিসমূহ (Major Committees)

  1. কেন্দ্রীয় ক্ষমতা সংক্রান্ত কমিটি (Union Powers Committee): জওহরলাল নেহেরু
  2. কেন্দ্রীয় সংবিধান সংক্রান্ত কমিটি (Union Constitution Committee): জওহরলাল নেহেরু
  3. প্রাদেশিক সংবিধান সংক্রান্ত কমিটি (Provincial Constitution Committee): সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল
  4. খসড়া কমিটি (Drafting Committee): ড. বি.আর. আম্বেদকর
  5. মৌলিক অধিকার, সংখ্যালঘু এবং উপজাতি ও বহির্ভূত এলাকা সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি (Advisory Committee on Fundamental Rights, Minorities and Tribal and Excluded Areas): সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল
  6. মৌলিক অধিকার উপকমিটি (Fundamental Rights Sub-Committee): জে. বি. কৃপালনী
  7. সংখ্যালঘু উপকমিটি (Minorities Sub-Committee): এইচ. সি. মুখার্জী
  8. উত্তর-পূর্ব সীমান্ত উপজাতি এলাকা এবং অসমের বহির্ভূত ও আংশিক বহির্ভূত এলাকা উপকমিটি: গোপীনাথ বরদলৈ
  9. বহির্ভূত এবং আংশিক বহির্ভূত এলাকা (অসম ছাড়া) উপকমিটি: এ. ভি. ঠক্কর
  10. উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত উপজাতি এলাকা উপকমিটি
  11. কার্যপ্রণালী নিয়ম সংক্রান্ত কমিটি (Rules of Procedure Committee): ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ
  12. রাজ্য সংক্রান্ত কমিটি / রাজ্যগুলোর সাথে আলোচনা কমিটি (States Committee): জওহরলাল নেহেরু
  13. স্টিয়ারিং কমিটি (Steering Committee): ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ

খসড়া কমিটি (Drafting Committee)

১৯৪৭ সালের ২৯ আগস্ট ড. বি.আর. আম্বেদকরের সভাপতিত্বে সর্বপ্রধান এই খসড়া কমিটি গঠিত হয়। এতে মোট ৭ জন সদস্য ছিলেন:

  1. . বি.আর. আম্বেদকর (চেয়ারম্যান)
  2. এন. গোপালস্বামী আয়ঙ্গার
  3. অলাদি কৃষ্ণস্বামী আয়ার
  4. . কে.এম. মুন্সী
  5. সৈয়দ মোহাম্মদ সাদাতুল্লাহ
  6. এন. মাধব রাও (অসুস্থতার কারণে পদত্যাগ করা বি.এল. মিত্তারের স্থলাভিষিক্ত হন)
  7. টি.টি. কৃষ্ণমাচারী (১৯৪৮ সালে মারা যাওয়া ডিপি খৈতানের স্থলাভিষিক্ত হন)

সংবিধানের গ্রহণ ও বলবৎকরণ (Enactment and Enforcement of the Constitution)

  1. ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর গণপরিষদে ভারতের সংবিধান গৃহীত (Adopted) হয়; তখন সংবিধানে একটি প্রস্তাবনা (Preamble), ৩৯৫টি অনুচ্ছেদ (Articles) এবং ৮টি তপশিল (Schedules) ছিল।
  2. ড. বি. আর. আম্বেদকর ছিলেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী এবং সংবিধান খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান; তাঁকে ‘ভারতীয় সংবিধানের জনক’ (Father of the Constitution of India) ও ‘আধুনিক মনু’ (Modern Manu) বলা হয়।
  3. ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি তারিখটিকে সংবিধানের প্রবর্তন বা বলবৎকরণের দিন (Date of Commencement) হিসেবে ধরা হয়; কারণ ১৯২৯ সালের ডিসেম্বর মাসে কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি ‘পূর্ণ স্বরাজ দিবস’ (Purna Swaraj Day) হিসেবে পালিত হয়েছিল।
  4. ১৯৮৭ সালের ৫৮তম সংবিধান সংশোধন আইনের (58th Constitutional Amendment Act, 1987) মাধ্যমে সংবিধানে ‘অনুচ্ছেদ ৩৯৪-এ’ (Article 394A) অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা সংবিধানের ২২ নম্বর খণ্ডে (Part XXII) সংযোজিত হয়েছে।
  5. এই অনুচ্ছেদের মাধ্যমে ভারতের রাষ্ট্রপতিকে সংবিধানের একটি প্রামাণ্য হিন্দি অনুবাদ (Authoritative Text in Hindi) প্রকাশের আইনি কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়।

DOWNLOAD PDF

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *